বাংলা বষ পঞ্জিকা কিভাবে এল
Mohammed
বন্ধুরা, কেউ কি উত্তর জানেন?
এই সাইট থেকে বাংলা বষ পঞ্জিকা কিভাবে এল পান।
বঙ্গাব্দ
বঙ্গাব্দ
উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
আজ বাংলাদেশ
বুধবার ২৩ ফাল্গুন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দভারত
বুধবার ২৩ ফাল্গুন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দবাংলা বর্ষপঞ্জি বা বঙ্গাব্দ হলো ভারতীয় উপমহাদেশের বঙ্গ অঞ্চলে ব্যবহৃত একটি সৌর বর্ষপঞ্জি।[১] বর্ষপঞ্জিটির একটি সংশোধিত সংস্করণ বাংলাদেশের জাতীয় ও সরকারি বর্ষপঞ্জি হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসাম রাজ্যে বর্ষপঞ্জিটির পূর্ববর্তী সংস্করণ অনুসরণ করা হয়। বাংলা বর্ষপঞ্জিতে নববর্ষ নামে পরিচিত।বাংলা সনকে বলা হয় [২] বা ,[৩] এখানে একটি শূন্য বছর আছে, যা শুরু হয় ৫৯৩/৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে। এটি যদি আগে হয় তবে গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির খ্রিস্টাব্দ বা সাধারণ সালের বছরের তুলনায় ৫৯৪ বছর কম, অথবা পরে হলে ৫৯৩ বছর কম হবে।
বাংলা বর্ষপঞ্জির সংশোধিত সংস্করণ ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়।[৪][৫] ভারতের বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐতিহ্যগত ভারতীয় হিন্দু বর্ষপঞ্জি ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে ও এটি হিন্দু উৎসবসমূহ নির্ধারণ করে।[১]
বাঙালি
বিষয়ক ধারাবাহিকের অংশ
দেখান বাঙালির ইতিহাস দেখান বাঙালি স্বদেশ দেখান বাঙালি জাতি দেখান বাঙালি সংস্কৃতি দেখান বাংলার প্রতীক দেখান রাজনীতি দেস
ইতিহাস[সম্পাদনা]
বৌদ্ধ/হিন্দু প্রভাব[সম্পাদনা]
কিছু ইতিহাসবিদ ৭ম শতাব্দীর হিন্দু রাজা শশাঙ্ককে বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনকারী বলে মনে করেন, যার শাসনকাল ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু হয়েছে বলে মনে করা হয়।[৩][৪][৬] বঙ্গাব্দ () শব্দটি আকবরের সময়কালের চেয়ে বহু শতাব্দী পুরনো দুটি শিব মন্দিরেও পাওয়া যায়, যা থেকে বোঝা যায় যে আকবরের সময়ের অনেক আগে থেকেই একটি বাংলা বর্ষপঞ্জি বিদ্যমান ছিল।[৩]
প্রাচীনকালে হিন্দুরা একটি বর্ষপঞ্জি পদ্ধতি গড়ে তুলেছিল।[৭] ছয়টি প্রাচীন বেদাঙ্গের মধ্যে একটি যার নাম ,[৮][৯] হল সময় ধরে রাখার জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানী সংস্থার গতিবিধি নজরদারি ও ভবিষ্যদ্বাণী করার বৈদিক যুগের ক্ষেত্র।[৮][৯][১০] এটি প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি বৈদিক আচার-অনুষ্ঠানের জন্য একটি পরিশীলিত সময় বজায় রাখার পদ্ধতি ও বর্ষপঞ্জি তৈরি করেছিল।[৭]
হিন্দু বিক্রমীয় বর্ষপঞ্জির নামকরণ করা হয়েছে রাজা বিক্রমাদিত্যর নামানুসারে এবং শুরু হয় ৫৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে।[১১] ভারতের গ্রামীণ বাঙালি সম্প্রদায়গুলোয়, ভারত ও নেপালের অন্যান্য অঞ্চলের মতো বাংলা বর্ষপঞ্জি "বিক্রমাদিত্য" নামে পরিচিত। যাইহোক, এই যেখানে এটি ৫৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শুরু হয় অঞ্চলগুলোর বিপরীতে বাংলা বর্ষপঞ্জি ৫৯৩ থেকে শুরু হয় যা প্রস্তাব করে যে প্রারম্ভিক সূত্রের বছরটি কিছু সময়ে সামঞ্জস্য করা হয়েছিল।[১২][১৩]
বিভিন্ন রাজবংশ যাদের অঞ্চল বাংলায় বিস্তৃত ছিল, ১৩শ শতাব্দীর আগে তারা বিক্রমীয় বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করত। উদাহরণস্বরূপ, পাল সাম্রাজ্যের যুগে সৃষ্ট বৌদ্ধ গ্রন্থ ও শিলালিপিতে "বিক্রম" ও আশ্বিনের মতো মাসগুলোর উল্লেখ রয়েছে, একটি পদ্ধতি প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যত্র সংস্কৃত গ্রন্থে পাওয়া যায়।[১৪][১৫]
হিন্দু পণ্ডিতরা সূর্য, চাঁদ ও গ্রহের চক্র পর্যবেক্ষণ এবং গণনা করে সময় রাখার চেষ্টা করতেন। সূর্য সম্পর্কে এই গণনাগুলো সংস্কৃতের বিভিন্ন জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত গ্রন্থে দেখা যায়, যেমন: ৫ম শতাব্দীতে রচিত আর্যভট্টের , লতাদেবের ৬ষ্ঠ শতাব্দীর ও বরাহমিহির দ্বারা পঞ্চ , ব্রহ্মগুপ্তের ৭ম শতাব্দীর এবং অষ্টম শতাব্দীর ।[১৬] এই গ্রন্থগুলো সূর্য ও বিভিন্ন গ্রহ উপস্থাপন করে এবং সংশ্লিষ্ট গ্রহের গতির বৈশিষ্ট্যগুলো অনুমান করে।[১৬] -এর মতো অন্যান্য গ্রন্থগুলো তম শতাব্দী থেকে ১০ম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে সম্পূর্ণ হয়েছে বলে জানা যায়।[১৬]
পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও ঝাড়খণ্ডের মতো ভারতীয় রাজ্যে বাঙালিদের দ্বারা ব্যবহৃত বর্তমান বাংলা বর্ষপঞ্জিটি সংস্কৃত পাঠ -এর উপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি প্রথম মাস বৈশাখ হিসেবে মাসগুলোর ঐতিহাসিক সংস্কৃত নাম ধরে রেখেছে।[৪] তাদের বর্ষপঞ্জিটি হিন্দু বর্ষপঞ্জি পদ্ধতির সাথে আবদ্ধ থাকে ও বিভিন্ন বাঙালি হিন্দু উৎসব নির্ধারণ করতে ব্যবহৃত হয়।[৪]
ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রভাব[সম্পাদনা]
আরেকটি তত্ত্ব হল যে বর্ষপঞ্জিটি প্রথম বাংলার একজন হোসেন শাহী সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (রাজত্বকাল ১৪৯৪-১৫১৯) বাংলায় প্রচলিত সৌর বর্ষপঞ্জির সাথে চন্দ্র ইসলামি বর্ষপঞ্জি (হিজরি) একত্রিত করে তৈরি করেছিলেন।[৩] অন্য একটি তত্ত্ব বলে যে শশাঙ্কের বর্ষপঞ্জিটি আলাউদ্দিন হোসেন শাহ কর্তৃক গৃহীত হয়েছিল যখন তিনি হিজরি বর্ষপঞ্জি দ্বারা ভূমি রাজস্ব আদায়ে অসুবিধা প্রত্যক্ষ করেন।[৩]
মুঘল শাসনামলে ইসলামি হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী বাঙালিদের কাছ থেকে ভূমি কর আদায় করা হতো। এই বর্ষপঞ্জি একটি চন্দ্র বর্ষপঞ্জি ছিল এবং এর নতুন বছরটি সৌর কৃষি চক্রের সাথে মিলতো না। কিছু সূত্র অনুসারে বর্তমান বাংলা বর্ষপঞ্জির উৎপত্তি বাংলায় মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনের জন্য হয়েছে, যিনি ফসল কাটার কর বছরের সময় এটি গ্রহণ করেছিলেন। বাংলা বঙ্গাব্দ বলা হয়। আকবর রাজকীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতুল্লাহ শিরাজিকে চান্দ্র ইসলামি বর্ষপঞ্জি ও সৌর হিন্দু বর্ষপঞ্জিকে একত্রিত করে একটি নতুন বর্ষপঞ্জি তৈরি করতে বলেন এবং এটি (ফসলি বর্ষপঞ্জি) নামে পরিচিত ছিল। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে এর মাধ্যমে বাংলা বর্ষপঞ্জির সূচনা হয়।[৪][৫] শামসুজ্জামান খানের মতে এটি হতে পারে যে একজন মুঘল গভর্নর নবাব মুর্শিদ কুলি খান, সর্বপ্রথম ঐতিহ্যকে "আনুষ্ঠানিক ভূমি কর আদায়ের দিন" হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন ও বাংলা বর্ষপঞ্জি শুরু করার জন্য আকবরের আর্থিক নীতি ব্যবহার করেছিলেন।[৬][১৭]
এটি হোসেন শাহ বা আকবর কর্তৃক গৃহীত হয়েছিল কিনা তা স্পষ্ট নয়। বাংলা বর্ষপঞ্জি ব্যবহারের প্রথা আকবরের আগে হোসেন শাহ শুরু করেছিলেন।[৩] অমর্ত্য সেনের মতে, আকবরের সরকারি বর্ষপঞ্জি "তারিখ-ইলাহি" ও এর ১৫৫৬ সালের শূন্য বছর ছিল পূর্ব-বিদ্যমান হিন্দু ও ইসলামি বর্ষপঞ্জির মিশ্রণ। আকবরের মুঘল দরবারের বাইরে ভারতে এটি খুব বেশি ব্যবহৃত হয়নি এবং তার মৃত্যুর পর তিনি যে বর্ষপঞ্জি চালু করেন তা পরিত্যক্ত হয়ে যায়। যাইহোক, সেন যোগ করেন, বাংলা বর্ষপঞ্জিতে "তারিখ-ইলাহি"-এর চিহ্ন রয়েছে।[১৮] সেন বলেন যে, বাংলা বর্ষপঞ্জি ও নতুন বছর কেউ গ্রহণ করুক না কেন, এটি ঐতিহ্যগত বাংলা বর্ষপঞ্জির উপর ভিত্তি করে বসন্তের ফসল কাটার পরে জমির কর আদায়ে সহায়তা করে, কারণ ইসলামি হিজরি বর্ষপঞ্জির মাধ্যমে সংগ্রহের তারিখ নির্ধারণে প্রশাসনিক অসুবিধা তৈরি করেছিল।[৩]
বাংলা সন ও পঞ্জিকা কীভাবে এলো
বাংলা সন ও পঞ্জিকা কীভাবে এলো
বাংলা সন ও পঞ্জিকা কীভাবে এলো
ইঞ্জি. সাইদ আহমেদ || রাইজিংবিডি.কম
প্রকাশিত: ০২:১৩, ১৪ এপ্রিল ২০১৮ আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
Share to Facebook Facebook Share to WhatsApp WhatsApp Share to Messenger Messenger Share to Copy Link Copy Link
খ্রিস্ট সপ্তম শতকের ‘হর্ষচরিত’ এবং অষ্টম শতকের ‘আর্য্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প’ গ্রন্থদ্বয় থেকে আমরা জানতে পারি, শশাঙ্ক গৌড়ের রাজা ছিলেন এবং হর্ষবর্ধনের থানেশ্বর রাজ্যপ্রাপ্তির পূর্বে তিনি গৌড়রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তবে এ থেকে শশাঙ্কের গৌড়রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রকৃত সময়, এমনকি আনুমানিক সময়ও নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। তখন সমগ্র বঙ্গকে ‘গৌড়’ বলা হতো। কিন্তু ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে আলবেরুনির ‘ভারততত্ত্ব’ গ্রন্থ এবং চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর ‘ভারত ভ্রমণকাহিনী’-র ইংরেজি অনুবাদ ভারতে প্রাপ্তির পরই কেবল জানা যায় ৬০৬ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে শশাঙ্ক গৌড়রাজ্যের রাজা হন। এ জন্য ইতিহাসবিদেরা শশাঙ্কের আনুমানিক সময় ধরেন ৬০০ খ্রিস্টাব্দ।
বর্তমানে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ এবং ১৪২৫ বঙ্গাব্দ চলছে। সময় দুটির বিয়োগফল ৫৯৫। এতে অনেকে অনুমান করেন ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে শশাঙ্ক গৌড়ের রাজা হন এবং সে সময় থেকে বঙ্গাব্দ প্রচলিত হয়। সুতরাং শশাঙ্কই বঙ্গাব্দের প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু নিম্নলিখিত কারণে সে মত মেনে নেওয়া যায় না :
শশাঙ্ক যে ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গাব্দ প্রতিষ্ঠিত করেন সে সম্পর্কে কোনো প্রমাণ নেই- না শশাঙ্কের মুদ্রায়, না শশাঙ্কের সময়ের কোনো লেখাপত্রে। তাছাড়া বঙ্গাব্দের আদি নাম ‘সন’। এ নাম প্রাচীন হিন্দু মন্দিরে উল্লেখ পাওয়া গিয়েছে। যেমন, ‘সন ১১২৭ সাল’ লেখা খড়গপুর, মেদিনীপুরের নন্দেশ্বর মন্দির, ‘সন ১১৩৪ সাল’ লেখা রামগোপালপুর, বর্ধমানের লক্ষ্মী জনার্দন মন্দির, ‘সন ১১৫৯ সাল’ লেখা কালনা, বর্ধমানের কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির ইত্যাদি। সন আরবি শব্দ। হিজরির রূপান্তরে বঙ্গাব্দের সৃষ্টি বলেই হয়তো এই ‘সন’ নাম। শশাঙ্ক প্রবর্তিত কোনো অব্দের নাম ‘সন’ হতে পারে না। সেটা হতে পারে কেবল শশাঙ্কাব্দ বা গৌড়াব্দ। কারণ শশাঙ্ক গৌড়রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
শশাঙ্কের সময় থেকে হাজার বছরের মধ্যে বঙ্গাব্দ ব্যবহারের কোনো নমুনা পাওয়া যায়নি। বঙ্গাব্দ ব্যবহারের যে সর্বপ্রাচীন নমুনা পাওয়া গিয়েছে সেটা ১৬৪৩ খ্রিস্টাব্দের। তাই অনেকে মনে করেন, খ্রিস্ট সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ায় শশাঙ্কের নামে ‘সন’ নাম দিয়ে কেউ বঙ্গাব্দ প্রচলন করে থাকতে পারেন। কিন্তু যেহেতু ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে শশাঙ্কের সঠিক সময়, এমনকি আনুমানিক সময় সম্পর্কেও কারও কোনো ধারণাই ছিল না, সেহেতু খ্রিস্ট সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ায় সঠিক সময় ধরে শশাঙ্কের নামে অব্দ প্রচলনের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
আলবেরুনির ‘ভারততত্ত্ব’ গ্রন্থের মূল কিংবা অনুলিপি- কিছুই ভারতে ছিল না। যদি থাকত, তা হলেও শশাঙ্কের আনুমানিক সময় নির্ধারণ করা সম্ভব হতো না। কারণ সেখানে হর্ষের তিনটি সময় পাওয়া যায় : খ্রিস্টপূর্ব ৪৫৬, ৩৪৩ খ্রিস্টাব্দ এবং ৬০৬ খ্রিস্টাব্দ। এ থেকে হর্ষের সঠিক সময় নির্ণয় করা যায় না। ফলে শশাঙ্কেরও আনুমানিক সময় নির্ণয় করা যায়নি।
এরপর আসে আকবর প্রসঙ্গ। আকবর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সিংহাসনে বসেন। তিনি পঞ্চাশ বছর রাজত্ব করেন। রাজত্বের অর্ধ সময়ের পর তিনি নিজেকে আরও স্মরণীয় করে রাখার জন্য দিন-ই-ইলাহি নামক একটি ধর্মমত প্রচার করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি তারিখ-ই-ইলাহি বা ইলাহি নাম দিয়ে একটি অব্দ প্রচলন করেন, যার গণনা দেখানো হয় ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে। ইলাহি সন প্রবর্তনের জন্য আকবরনামায় আকবরের যে ফরমান দেখা যায়, তাতে ইলাহি সন প্রচলনের নির্দেশ ছাড়াও ‘বিশুদ্ধ শুক্লপক্ষ পদ্ধতিতে’ পঞ্জিকা তৈরির নির্দেশ ছিল। নির্দেশ পাঠানো হয় সম্রাটের অধিরাজ্যের সকল পঞ্জিকাকার প্রণেতাদের নিকট। তারই ফলে হিজরির সঙ্গে ভারতীয় হিন্দুবর্ষের সমন্বয়ে হিজরির রূপান্তরে বিহারসহ উত্তর ভারতে ফসলি সন, উড়িষ্যায় বিলায়তি ও আমলি সন এবং বঙ্গে সন বা বাংলা সন নামক পৃথক পৃথক আঞ্চলিক অব্দগুলি প্রচলিত হয় স্থানীয় পঞ্জিকাকারদের দ্বারা। আকবরের ইলাহি সন প্রবর্তনের সঙ্গে হিজরির রূপান্তরের কোনো বিষয় ছিল না। ১ ইলাহি = ৯৬৩ হিজরি = ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ। কিন্তু ৯৬৩ বাংলা = ৯৬৩ হিজরি = ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ। সুতরাং যাঁরা বলেন ইলাহি সনই বঙ্গে বাংলা সন হয়েছে, তাঁরা সঠিক কথা বলেন না। আবার অনেকে বলেন পূর্বে বাংলা সনের নাম ছিল ফসলি সন, কিন্তু সেটাও ঠিক নয়। বাংলা ও ফসলি পৃথক দুটি সন।
গণিতের সাহায্যে বঙ্গাব্দের জন্য হিজরির রূপান্তর-সময় পাওয়া যায় ১৫৪৪ খ্রিস্টাব্দ। তখন পহেলা বৈশাখ হয়েছিল ৭ই এপ্রিলে। ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দেও পহেলা বৈশাখ হয়েছিল ৭ই এপ্রিলে। অনেকেই বলেন ১১ই এপ্রিল। এটা ভুল। পহেলা বৈশাখ ১১ই এপ্রিলে প্রথম হয় ১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে। তার পূর্বে তারিখ ক্রমেই হ্রাস পেয়েছে। সুতরাং ১৫৪৪ কিংবা ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে পহেলা বৈশাখের তারিখ ১১ই এপ্রিল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই (এ ব্যাপারে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে ‘বঙ্গাব্দের ইতিহাস’ গ্রন্থে)। তবে আকবর যেহেতু সমগ্র বঙ্গ নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেননি, তাই বঙ্গের সুলতান হোসেন শাহকে অনেকে বঙ্গাব্দের প্রবর্তক বলে মনে করেন। হেসেন শাহর রাজত্বকাল ছিল ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। সময়টি বঙ্গাব্দের জন্য হিজরির রূপান্তর-সময় ১৫৪৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পড়ে না। তাই হোসেন শাহকে বঙ্গাব্দের প্রবর্তক বলা যায় না।
বাংলা সনে যে পঞ্জিকা ব্যবহৃত হয় সেটাকে বাংলা পঞ্জিকা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে সেটা সর্বভারতীয় হিন্দু পঞ্জিকা। এই পঞ্জিকা সৃষ্টির শুরুটা খ্রিস্টপূর্ব ১১০০-র যজুর্বেদ থেকে। দিন, বার এবং হিন্দুদের বর্ষ, মাস, পক্ষ, তিথি, নক্ষত্র, রাশি, লগ্ন ইত্যাদির তথ্যযুক্ত বিশেষ পঞ্জিকাই হলো হিন্দু পঞ্জিকা। যার সৃষ্টি হিন্দু জ্যোতির্বিদ্যা থেকে। বৈদিক গ্রন্থে হিন্দু জ্যোতির্বিদ্যার তথ্য পাওয়া যায়। হিন্দু পঞ্জিকা সৃষ্টির ৩টি কাল ধরা যায় : এক বৈদিক কাল (খ্রিস্টপূর্ব ১১০০-র যজুর্বেদ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ পর্যন্ত), দুই বেদাঙ্গ জ্যোতিষকাল (খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ থেকে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) এবং তিন সিদ্ধান্ত জ্যোতিষকাল (প্রথমে ২৮৫ খ্রিস্টাব্দ, পরে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত)। এখন সিদ্ধান্ত জ্যোতিষকাল চলছে, যার বিবরণ নিচে দেওয়া হলো :
বাংলা বর্ষপঞ্জি
বাংলা বর্ষপঞ্জি
English
বাংলা বর্ষপঞ্জি ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবর এর প্রবর্তন করেন। এই নতুন বর্ষপঞ্জিটি প্রথমে তারিখ-ই-এলাহী নামে পরিচিত ছিল; ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ এটি বঙ্গাব্দ নামে প্রচলিত হয়। নতুন এই সালটি আকবরের রাজত্বের ঊনত্রিশতম বর্ষে প্রবর্তিত হলেও তা গণনা করা হয় ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৫ নভেম্বর থেকে, কারণ এদিন আকবর দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে হিমুকে পরাজিত করে সিংহাসনে আরোহণ করেন।তারিখ-ই-এলাহীর উদ্দেশ্য ছিল আকবরের বিজয়কে মহিমান্বিত করে রাখা এবং একটি অধিকতর পদ্ধতিগত উপায়ে রাজস্ব আদায়ে সহায়তা করা। এর পূর্বে মুগল সম্রাটগণ রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে হিজরি বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করেতেন। আবুল ফজল আকবরনামা গ্রন্থে বলেছেন যে, হিজরি বর্ষপঞ্জির ব্যবহার ছিল কৃষক শ্রেণির জন্য একটি ক্লেশকর ব্যাপার, কারণ চান্দ্র ও সৌর বর্ষের মধ্যে ১১/১২ দিনের ব্যবধান এবং এ কারণে ৩১ চান্দ্রবর্ষ ৩০ সৌরবর্ষের সমান ছিল। সে সময় চান্দ্রবর্ষ অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করা হতো, কিন্তু ফসল সংগ্রহ করা হতো সৌরবর্ষ অনুযায়ী। আকবর তাঁর রাজত্বের শুরু থেকেই দিন-তারিখ গণনার একটি বিজ্ঞানভিত্তিক, কর্মোপযোগী ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি চালুর জন্য বর্ষপঞ্জি সংস্কারের প্রয়োজন অনুভব করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমির ফতুল্লাহ শিরাজীকে প্রচলিত বর্ষপঞ্জিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধনের দায়িত্ব অর্পণ করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ৯৬৩ হিজরির মুহররম মাসের শুরু থেকে বাংলা বর্ষের ৯৬৩ অব্দের সূত্রপাত হয়। যেহেতু ৯৬৩ হিজরির মুহররম মাস বাংলা বৈশাখ মাসের সঙ্গে সামজ্ঞস্যপূর্ণ ছিল, সেহেতু চৈত্র মাসের পরিবর্তে বৈশাখ মাসকেই বাংলা বর্ষের প্রথম মাস করা হয়; চৈত্র ছিল শক বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস, যা সে সময় বঙ্গে ব্যবহূত হতো।
তারিখ-ই-এলাহী প্রবর্তন থেকে অতিক্রান্ত ৪৪৫ বছরের মধ্যে হিজরি ও বাংলা বর্ষপঞ্জির মধ্যে ১৪ বছরের পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। এর কারণ ইসলামি হিজরি বর্ষ হচ্ছে চন্দ্রনির্ভর, আর বাংলাবর্ষ সূর্যনির্ভর এবং সৌরবর্ষ থেকে চান্দ্রবর্ষ ১১ দিন কম। তবে বাংলাবর্ষ ও গ্রেগোরিয়ান বর্ষের মধ্যে এই পার্থক্য নগণ্য, কারণ উভয়ই সৌরবর্ষভিত্তিক। তারিখ-ই-এলাহী প্রবর্তনের সময়ে গ্রেগোরিয়ান ও হিজরি বর্ষের মধ্যে পার্থক্য ছিল ১৫৫৬-৯৬৩ = ৫৯৩ বছর, যা বর্তমানেও কার্যকর; অর্থাৎ বাংলা সনের সঙ্গে ৫৯৩ যোগ করলে খ্রিস্টীয় সন পাওয়া যায়।
আকবরের সময়ে মাসের প্রতিদিনের জন্য একটি করে স্বতন্ত্র নাম ছিল, কিন্তু এতগুলি নাম মনে রাখা ছিল একটি কষ্টসাধ্য ব্যাপার; তাই সম্রাট শাহজাহান তাঁর ফসলি সনে সেগুলিকে সাপ্তাহিক পদ্ধতিতে রূপান্তরিত করেন। সম্ভবত একজন পর্তুগীজ পন্ডিতের সহায়তায় তিনি সাত দিনের সমন্বয়ে এই সপ্তাহ-পদ্ধতি চালু করেন। ইউরোপে ব্যবহূত রোমান নামকরণ পদ্ধতির সঙ্গে সপ্তাহের দিনগুলির লক্ষণীয় মিল রয়েছে, যেমন: Sun (Sunday)-এর সঙ্গে রবির; Moon (Monday)-এর সঙ্গে সোমের; Mars (Tuesday, or Tiwes Daeg, the day of Tiw, Mars, the god of war)-এর সঙ্গে মঙ্গলের; Mercury (Wednesday)-এর সঙ্গে বুধের; Jupiter (Thursday)-এর সঙ্গে বৃহস্পতির; Venus (Friday)-এর সঙ্গে শুক্রর এবং Saturn (Saturday)-এর সঙ্গে শনির। পাশ্চাত্য বর্ষপঞ্জির মতোই বাংলা সপ্তাহও তখন রবিবারে শুরু হতো।
দিনের নামের মতো এক সময় মাসগুলির নামও পরিবর্তন করা হয়। প্রথমদিকে মাসগুলি ফারওয়ারদিন, উর্দিবাহিশ, খোরদাদ, তীর, মুরদাদ, শাহারিবার, মেহের, আবান, আজার, দে, বাহমান এবং ইসফান্দ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীকালে মাসগুলির নাম কীভাবে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ইত্যাদি হয় তা জানা না গেলেও এটা সন্দেহাতীত যে, এ নামগুলির ভিত্তি ছিল বিভিন্ন তারকা। অনুমান করা হয় যে, শক রাজবংশের স্মরণার্থে ৭৮ খ্রিস্টাব্দে প্রবর্তিত শকাব্দ থেকে এ নামগুলি এসেছে। যে তারকামন্ডলীর নামানুসারে বাংলা মাসগুলির নামকরণ করা হয় সেগুলি: বিশাখা থেকে বৈশাখ, জ্যেষ্ঠা থেকে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়া থেকে আষাঢ়, শ্রবণা থেকে শ্রাবণ, ভাদ্রপদ থেকে ভাদ্র, অশ্বিনী থেকে আশ্বিন, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, অগ্রাইহনী থেকে অগ্রহায়ণ, পুষ্যা থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, ফল্গুনী থেকে ফাল্গুন এবং চিত্রা থেকে চৈত্র। অগ্রহায়ণ মাসের নামের আরেকটি ব্যাখ্যা: অগ্র = প্রথম, হায়ন = বর্ষ বা ধান্য; পূর্বে এই মাস থেকে বর্ষগণনা শুরু হতো বা এই সময়ে প্রধান ফসল ধান কাটা হতো; তাই এই মাসের নাম হয় অগ্রহায়ণ।
বাংলা বর্ষপঞ্জি বা বঙ্গাব্দ বাঙালির নিজস্ব সন হলেও বৈশ্বিক যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে বাংলাদেশের প্রায় সব ক্ষেত্রেই খ্রিস্টীয় সন অনুসৃত হয়। ৩৬৫ দিনে সৌরবর্ষ গণনা করা হলেও প্রকৃতপক্ষে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে যেহেতু পৃথিবীর ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ও ৪৭ সেকেন্ড সময় লাগে, সেহেতু খ্রিস্টীয় সনের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতি ৪ বছরে অতিরিক্ত ১ দিন বাড়ানো হয়; একে অধিবর্ষ বা অতিবর্ষ (লিপ ইয়ার) বলে। খ্রিস্টীয় সনের মতো এই অধিবর্ষের অস্তিত্ব পূর্বে বঙ্গাব্দেও ছিল। এর ফলে খ্রিস্টীয় সনের সঙ্গে বঙ্গাব্দের দিন-তারিখের হিসাবে গরমিলের কারণে জনসাধারণের পক্ষে উভয় সন গণনায় সমস্যা হতো। এই সমস্যা দূর করার জন্য ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমীর তত্ত্বাবধানে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র নেতৃত্বে একটি বঙ্গাব্দ সংস্কার কমিটি গঠিত হয়। উক্ত কমিটি চার বছর পরপর চৈত্র মাস ৩০ দিনের পরিবর্তে ৩১ দিনে গণনা করার পরামর্শ দেয়। এভাবে বঙ্গাব্দ বিশ্বের আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত সনগুলির সমমর্যাদা লাভ করে। [সৈয়দ আশরাফ আলী]
বন্ধুরা, কেউ কি উত্তর জানেন?